সন্ত্রাস কি এবং প্রতিরােধ ও প্রতিকারের উপায়

সন্ত্রাস কি এবং প্রতিরােধ ও প্রতিকারের উপায়

সন্ত্রাস কি এবং প্রতিরােধ ও প্রতিকারের উপায়: সন্ত্রাসের মূল কথা বল প্রয়োেগ বা বল প্রয়ােগের ভীতি প্রদর্শন করে কোনাে উদ্দেশ্যসাধন বা কার্যোদ্ধারের চেষ্টা করা। এটা যেমন দৃষ্কৃতকারীরা বা সমাজবিরােধীরা করতে পারে, তেমনি সমগ্র রাষ্ট্রে তথা সমগ্র বিশ্বের পটভূমিতেও এমন চেষ্টা হতে পারে । সন্ত্রাস সমাজে যুগ যুগ ধরে চলছে। সন্ত্রাসের প্রধান উৎসগুলাে নিম্নে উল্লেখ করা হলাে।

  • কোনাে লক্ষ্য অর্জনে সহিংস কর্মপন্থা গ্রহণ অথবা সহিংসতা ব্যবহারের হুমকি। 
  • বঞ্চিত শ্রেণির মানবাধিকার রক্ষার জন্য সহিংস এবং অন্যান্য চরমপন্থী কর্মকাণ্ড পরিচালনা । 
  • সহিংসতার লক্ষ্যে নিরীহ মানুষের জীবন ও সম্পত্তির ক্ষতিসাধন অথবা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে আক্রমণের লক্ষ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। 
  • অধিকার আদায়ে আইনগত বিধান ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের উপায় থাকা সত্ত্বেও সহিংস কর্মপন্থা ব্যবহার করা ।

Table of Contents

সন্ত্রাস কি এবং প্রতিরােধ ও প্রতিকারের উপায়

সন্ত্রাসের ধরন 

অপরাধী চক্রের দ্বারা সংগঠিত সন্ত্রাস 

অপরাধী চক্রের দ্বারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। এই অপরাধী চক্র সংগঠিতভাবে সন্ত্রাস চালায় । এদের এক শীর্ষ নেতা থাকে, যে লােকচক্ষুর আড়ালে থেকে নিজের নিয়ােজিত লােক দ্বারা মানুষ খুন, চাঁদাবাজি ইত্যাদি কর্মকাণ্ড করে থাকে। এছাড়া নানাভাবে মানুষের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। 

রাজনৈতিক সন্ত্রাস 

কোনাে কোনাে রাজনৈতিক দল, সংগঠন বা গােষ্ঠীবিশেষ রাজনীতির নামে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড অবলম্বন করে। ধর্মের নামে এদের কাউকে কাউকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে দেখা যায় । শ্রেণি-সংগ্রামের নামেও কোনাে কোনাে দল বা সংগঠন সহিংস তৎপরতায় লিপ্ত হয়। আবার দেশের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের ছত্রচ্ছায়ায়ও কখনাে কখনাে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতে দেখা যায় । 

আদর্শভিত্তিক সন্ত্রাস 

কোনাে গােষ্ঠী তাদের সুনির্দিষ্ট আদর্শ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সন্ত্রাসের পথ বেছে নিতে পারে। একসময় শ্রেণিশত্রু খতমের নামে আমাদের দেশে অনেক রাজনৈতিক হত্যা হয়েছে। ধর্মীয় জঙ্গিবাদ মুসলমান, হিন্দু, খ্রিষ্টান এবং ইহুদি সহ সকল সম্প্রদায়ের লােকদের মধ্যে বিরাজমান। ধর্মীয় জঙ্গিগােষ্ঠীগুলাে সহিংস পন্থায় সাধারণ মানুষ হত্যা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি সাধন করে থাকে। এসব হচ্ছে ধর্মের নামে চূড়ান্ত ধর্মবিরােধী কাজ। 

রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস 

অনেক সময় রাষ্ট্র নানা অজুহাতে সন্ত্রাসী পন্থা অবলম্বন করে প্রতিষ্ঠান বা জনগােষ্ঠীর উপর দমন-পীড়ন চালায়। এরূপ অবস্থা হলাে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস । যেমন : ইসরাইল রাষ্ট্র প্যালেস্টাইনের জনগণের উপর বিভিন্ন সময় এ ধরনের তৎপরতা চালিয়ে আসছে। রাষ্ট্রের অভ্যন্তরস্থ সংখ্যালঘু বা ভিন্ন জনগােষ্ঠীর উপরও এরূপ আক্রমণ পরিচালিত হতে দেখা যায়। 

সন্ত্রাস কি এবং প্রতিরােধ ও প্রতিকারের উপায়

সন্ত্রাস কি এবং প্রতিরােধ ও প্রতিকারের উপায়

সন্ত্রাসের কারণ : 

সন্ত্রাস দুটি কারণে সংঘটিত হয়, 

  • ক) সাধারণ কারণ, 
  • খ) বহিঃস্থ কারণ। 

সাধারণ কারণ 

অর্থনৈতিক বৈষম্য 

কোনাে সমাজে সম্পদের অসম বণ্টন থাকলে একশ্রেণির লােক অধিক ধনী হয় এবং অন্য শ্রেণি অধিকতর দরিদ্র হয়। এ অবস্থা বঞ্চিতদের মনে ক্ষোভের সৃষ্টি করে। ফলে নিম্ন আয়ের পরিবারে ক্ষুধা নিবৃত্তি, দারিদ্র্য ও বেকারত্ব কাটিয়ে উঠার জন্য পরিবারের কেউ কেউ অল্প সময়ের মধ্যে বেশি টাকা উপার্জনের জন্য অপরাধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়। 

এছাড়া বেকারত্ব আমাদের দেশে একটি সামাজিক ব্যাধি । যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে সমাজের কর্মক্ষম যুবসমাজের উপর । এর ফলে যুবসমাজ অনৈতিক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে নিজেদের ভাগ্য নির্মাণে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হতে উদ্বুদ্ধ হয়।

সংকীর্ণ রাজনৈতিক সংস্কৃতি 

একটি দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে যদি স্বার্থপরতা প্রবল থাকে এবং রাজনীতি যদি হয় ব্যক্তিস্বার্থ ও দলীয় স্বার্থ উদ্ধারের হাতিয়ার, তাহলে সেই রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সন্ত্রাসের জন্ম অস্বাভাবিক নয়। কারণ, ব্যক্তিস্বার্থ আদায়ের জন্যই সন্ত্রাসীদেরকে লালন-পালন করতে হয় । 

সুশাসনের অভাব 

অপরাধীকে খুঁজে বের করে শাস্তি প্রদানের ব্যবস্থা করা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের দায়িত্ব। কিন্তু প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক চাপের কারণে প্রশাসন অনেক সময় নীরব ভূমিকা পালন করে । 

এছাড়া আইন প্রয়ােগকারী সংস্থার কাঠামােগত দুর্বলতা রয়েছে। যেমন : দুর্বল প্রশিক্ষণ, পুরনাে অস্ত্র, পুলিশ ও জনসংখ্যার ভারসাম্যহীন অনুপাত যা সন্ত্রাস দমনে আইন-প্রয়ােগকারী সংস্থার ভূমিকাকে দুর্বল করে। এসব কারণে অনেক দুর্বল সন্ত্রাসীরাও শক্তি প্রদর্শনে সক্ষম হয়। তাছাড়া উন্নত প্রশিক্ষণ না পাওয়ার কারণে অনেক সময় বিদ্যমান গােয়েন্দা সংস্থাগুলাে দ্বারা সমকালীন সন্ত্রাসবাদ মােকাবেলা করা সম্ভব হয় না।

বহিঃস্থ কারণ

সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে যেমন অভ্যন্তরীণ ইন্ধন কাজ করে, তেমনি এর পিছনে বাইরের ইন্ধনও থাকতে পারে। অবৈধ অস্ত্রের যােগান, অবৈধ অস্ত্রের সহজলভ্যতাও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের পিছনে কাজ করে বলে ধারণা করা হয় । 

সন্ত্রাস প্রতিরােধ ও প্রতিকারের উপায় 

বাংলাদেশে সন্ত্রাস একটি সামাজিক ব্যাধি। একে যেমন প্রতিরােধ করা যায়, তেমনি নিরাময় করা যেতে পারে। সন্ত্রাস যাতে জন্ম নিতে না পারে এবং সন্ত্রাসীরা যাতে নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করতে না পারে সে জন্য নিমােক্ত ব্যবস্থাদি গ্রহণ করা আবশ্যক।

সন্ত্রাসবিরােধী আইন প্রণয়ন : 

সন্ত্রাস দমনের লক্ষ্যে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রণয়ন করা আবশ্যক। যারা প্রকাশ্যে আইন-শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে নাগরিকদের জানমালের ক্ষতি সাধন করছে, তাদেরকে কোনােভাবে ক্ষমা করা যায় না । সন্ত্রাস দমনের জন্য চরম শাস্তির ব্যবস্থা করলে সন্ত্রাস অনেকটা কমে যাবে আশা করা যায়।

পুলিশ প্রশাসনের পুনর্গঠন : 

সন্ত্রাস প্রতিরােধের জন্য পুলিশ বাহিনীকে আধুনিক অস্ত্রে ও যন্ত্রপাতিতে সজ্জিত করতে হবে এবং যুগােপযােগী প্রশিক্ষণ দিতে হবে। তাছাড়া আমাদের দেশে পুলিশ ও জনসংখ্যার অনুপাতে ব্যাপক ব্যবধান বিদ্যমান। 

এখানে প্রায় ১৪০০ মানুষের জন্য একজন পুলিশ কর্মকর্তা। এ অবস্থার নিরসন হওয়া বাঞ্ছনীয়। পুলিশের সংখ্যা, পুলিশ ফাঁড়ি, থানার সংখ্যা বৃদ্ধি করা প্রয়ােজন।

কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও বেকার ভাতা প্রদান : 

দেশে কুটির শিল্প, বৃহদায়তন শিল্প ও কলকারখানা স্থাপন, সকল ক্ষেত্রে শূন্যপদ পূরণ ও নতুন নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরি করতে হবে। বেকারত্ব দূরীকরণ সম্ভব হলে সন্ত্রাসী কর্মতৎপরতা অনেকাংশে হ্রাস পাবে। বেকারত্ব দূরীকরণের জন্য অগ্রসর দেশের মতাে না হলেও ন্যূনতম জীবনমান বজায় রাখার মতাে বেকার ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা করা দরকার । সামাজিক নিরাপত্তা হিসেবে বেকার ভাতা উত্তম ব্যবস্থা। 

সর্বজনীন শিক্ষা ও মূল্যবােধের জাগরণ : 

সবার জন্য শিক্ষার সুযােগের মাধ্যমে নাগরিকদের মধ্যে সামাজিক ও নৈতিক বােধ জাগ্রত করতে হবে। এ উদ্দেশ্যে বিদ্যালয় এবং বিভিন্ন শিক্ষা কর্মসূচিতে নৈতিক শিক্ষার ব্যবস্থা করা যায়। এতে সন্ত্রাসমূলক কার্যকলাপ প্রতিরােধ ও প্রতিকার সম্ভব হবে। 

রাজনৈতিক দলে সন্ত্রাসীদের আশ্রয় না দেওয়া : 

রাজনৈতিক দলে কোনাে সন্ত্রাসীকে আশ্রয় দেওয়া যাবে না। কোনাে দল সন্ত্রাসীদের মদদ দিলে বা আশ্রয় দিলে সে দলের রেজিস্ট্রেশন বাতিল করতে হবে । এমন দলের কোনাে সদস্যকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হবে না, এ মর্মে সংসদে আইন তৈরি করতে পারে। 

প্রশাসনিক কঠোরতা : 

সন্ত্রাস দমন, ঘুষ ও দুর্নীতি বন্ধ, স্বজনপ্রীতি রােধ এবং কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে পুলিশ প্রশাসন ও সাধারণ প্রশাসন যাতে কাজ করতে পারে তা নিশ্চিত করতে হবে। 

গণসচেতনতা : 

জনগণের সচেতন প্রতিরােধ সন্ত্রাস দমনে খুবই কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। জনগণ সচেতনভাবে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সােচ্চার ও সংঘবদ্ধ হলে সন্ত্রাস বহুলাংশে হ্রাস পাবে। নাগরিক হিসেবে আমাদের করণীয় নাগরিক হিসেবে আমরা সন্ত্রাসী তৎপরতা সম্পর্কে সচেতন থাকব। 

সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের খারাপ দিকগুলাে সম্পর্কেও আমরা জানব। সন্ত্রাসী তৎপরতা রােধে আমরা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে সহায়তা করব। সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবােধ মেনে চলব । এই ধরনের আরও পোষ্ট পেতে আমাদের poramorso24.com নিয়মিত ভিজিট করুন । ধর্যসহকারে পড়ার জন্য ধন্যবাদ।

আরও পড়ুন

  1. স্বাধীনতা বলতে কি বোঝায়
  2. ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের গুরুত্ব ও তাৎপর্য – Importance of the Election of 1954
  3. আইন বিভাগ: আইনের প্রকারভেদ ও আইনের উৎস 
  4. স্বাধীনতা ঘােষণা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *